Select your language

কথকতার ছলে জীবনের গল্প বলে মেয়েদের দল Mad Balikas
পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 21 মে 2024

কেটলিতে আধহেমন্তের সকাল বুড়বুড়ি কাটছে। ঐ ঘাড়ে ঘাড়ে জোলো দুধ আর চিনির ডেলা পড়ল। রং দেখ, যেন সাক্ষাৎ মে মাসের দুপুর। সামান্য শিউরে উঠলেন সাঁপুইবাবু। হাতে হাতে পাচার হয়ে যে ভাঁড়টা এসে পৌঁছল তার খোঁদলে উষ্ণ তরলের ওপর পুরু সর। তাও মুখ দেখার ব্যর্থ চেষ্টা তিনি করবেনই। রোজকার মতন। রিফ্লেক্স।

খুব বেশী বাজেনি। শহর এখনও বিছানায় এপাশ ওপাশ। ক্যামোমাইল চায়ের রং ধরছে রোদে। এডুয়ার্ডো বলত ক্যামোম। সাঁপুইবাবুও একটা আদরের নাম রেখেছিলেন। রাণীর চা। ক্লিওপেট্রার ফেভারিট ছিল নাকি। রোজ রাতে ঐ এককাপ। রাণীও কি ওতে মুখ দেখতেন?

একটু সরে বসলেন। লোকজন বাজারের ব্যাগ ফ্যাগ নিয়ে আসছে। মাছ কুটতে দিয়ে এসে নিমাইয়ের বেঞ্চিতে ওয়েটিং চলবে। আলু পটলের দাম ভিড় করে অন্যদিন, আজ কমলা নিয়ে পড়েছে সবাই। চেতলার ভরা বাজারে সাঁপুইবাবু পাহাড় দেখতে পেলেন। কমলার ঢল শুরু হয়েছে সবে। সোমবার সকালবেলা ফার্স্ট আওয়ারে মীটিং। তাঁর কাপেও কমলা থাকবেই। অরেঞ্জ পিকো। এডুয়ার্ডো আর্ল গ্রে নিয়ে বসত। বেলা অবধি কেটলি কেটলি চা উড়ে যেত। কাঞ্চনজঙ্ঘা সাক্ষী।

নিমাইয়ের দোকানে বিজবিজে ভিড় বাড়ছে। উঠে পড়লেন সাঁপুইবাবু। দুধের ডিপোর সামনে কলেজব্যাগ নিয়ে দুজন। ছেলেটা এককানে হাত রেখেছে। মেয়েটার গালে হালকা গোলাপী। ফার্স্ট ফ্লাশ। গলিতে ঢুকে পড়লেন সাঁপুইবাবু। কণিকা বেঁচে থাকলে ঐ মেয়েটার চেয়ে একটু বড়ো হত।

চেতলার অলিতে গলিতে এখনও এরকম বাড়ী আছে। সাত শরিকের অভিশাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। প্রোমোটারে ছুঁতে সাহস করে না। সাঁপুইবাবু সাবধানে লকারের চাবি ঘোরালেন। আখরোট কাঠের বাক্স। কাশ্মীরী কাজ। ডালা খুলতেই রাণী হেসে উঠলেন।

টী-সেটটার গায়ে হাত বোলালেন সাঁপুইবাবু। ডাঁটিগুলো সোনার। জাপানের রাজবংশের জিনিস। নিলামে কেনা। তিনি বলে রাখতে পেরেছেন। কণিকার অসুখের সময় বৌ এটাও বেচতে চেয়েছিল। চা বাগান ততদিনে বন্ধ। সাঁপুইবাবু রাজি হতে পারেননি। যার যাবার সে যায় যাক। যমরাজের সাথে পাল্লা দিয়ে লাভ?

বাক্সের কোণে রাখা মসলিনের বটুয়াটা সাবধানে তুললেন তিনি। কণিকাকে পুড়িয়ে সদ্য ফিরেছেন শ্মশান থেকে। এডুয়ার্ডো এসেছিল। ক্যামোমের শেষ প্যাকেটটা দিয়ে বিদায় জানাতে। কথাবার্তার মাঝখানে বৌ বঁটি নিয়ে তেড়ে এসেছিল। সেই তিনি বুঝলেন বৌয়ের মাথাটা গোলমাল করছে। ঝামেলায় প্যাকেটটা আর খোলা হয়নি।

বটুয়াটা এক চিলতে ফাঁক করে বুক ভরে শ্বাস নিলেন সাঁপুইবাবু। সুঘ্রাণ। আজ খাবেন? এককাপ? স্বচ্ছ রোদের রঙে আলো চলকে পড়বে। কাপের মেঝেতে রাণী হাসবেন তাঁর দিকে চেয়ে। ডিনার তো সেই রাতে। নিমাইয়ের মাটিগোলা আর পাঁউ। এখন হবে নাকি এক কাপ? চা?

আপনার মতামত

এর উত্তরে Some User

এই বিভাগের অন্যান্য পোস্টসমূহ

  • মিডডে মিল

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 28 জুন 2026

    ঘটনা নব্বই-একানব্বই সালের। সেদিন গার্জেনদের ডেকেছিলেন রেবাদি। তখনও তিনি ব্রহ্মচারিণী রেবাদি, সারদা আশ্রমের হেডমিস্ট্রেস। ছোটো করে বড়দি। প্রব্রাজিকা সারদাপ্রাণা হবেন আরও কয়েক বছর পর। ছোটোখাটো চেহারার শান্তশিষ্ট মানুষটি ভয়ানক ব্যক্তিত্ব নিয়ে এসে দাঁড়ালে ক্লাসশুদ্ধু দামাল মেয়েরা শান্ত হয়ে যেত, তাদের বাবা মায়েদের কথাই আলাদা। তো সেদিন বড়দি মেয়েদের গার্জেনদের ডেকে বললেন বাচ্চাদের ভালো করে খেতে দেবেন। একটা ডিমসেদ্ধ অন্তত দেবেন। মর্নিং সেকশন, সকালের খিদে নিয়ে পড়তে পারবে না। কয়েকজন মা কুঁইকুঁই করে বললেন এত সকালে মেয়েদের দুধ বিস্কুট ছাড়া কিছু খাওয়ানো যায় না। বাস্তবিক, ওয়ান থেকে ফোর আমাদের সকাল ছটা দশের মধ্যে ঢুকে যেতে হত। সকালে ভারি ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব ছিলো। বড়দি ভুরু কুঁচকে বললেন, “টিফিনে দিয়ে দেবেন। ওদের ডিম দেবেন, পেট যেন ভর্তি থাকে।”

    অকুস্থলে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন, যেমন আমার মা। 

  • একশো উত্তম

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 24 জুলাই 2024

    উঁহু। এ ছবি দেখার মত দৃষ্টিদান আমাকে তো কেউ করে নি। ও আমি কামনাও করিনে। মর্যাদা বলে তো একটা ব্যাপার আছে না কি? ঐ থোবড়া দেখে গোটা বসু পরিবার দিওয়ানা হয়ে গেল, সে কার পাপে বলে দিতে হবে? মুরোদ সাড়ে চুয়াত্তর পয়সার, আর রোয়াব লাখ টাকার। বৌ ঠাকুরাণীর হাটে বেচে দাও না, ঠেলে উঠবে মরণের পারে। যদিও ওরা থাকে ওধারে, তাও তো চাঁপাডাঙার বৌটাকে ঝাড়ি মারে এন্তার। হাবভাব এমন, উনি অন্নপূর্ণার মন্দির বানিয়ে অগ্নিপরীক্ষা দিচ্ছেন যেন।

  • এনকাউন্টার

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 12 জুলাই 2026

    "প্রভু, দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমানে আঘাতে
    সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।"

    বলাই বাহুল্য এসব বলে গান্ধারী কিছুই আটকাতে পারেননি। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, আস্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, কোনও কিছুই এসব ধর্মকথা হাতে নিয়ে বসে থাকেনি। এই যুগের গুরুজনেরা তো বলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেও অর্বাচীন কম নন, তিনি তো আর দেশভাগের ক্রাইসিস দেখেননি! ঐজন্যেই গান্ধারীর আবেদনে অত নীতিকথা লিখেছেন।

    তা দেখুন, গুরুজনেরা, বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুজনেরা বলেন যখন ঠিকই বলবেন, তাঁদের বক্তব্যে ভুল ধরতে গেলে ঠিকানা পরিবর্তনের দরকার পড়তে পারে। সেটা কথা নয়। প্রশ্নটা হলো, বাংলায় এনকাউন্টার ফিরে পেয়ে আমরা ভেরি হ্যাপি। মেয়েদের বিচার এসে গেছে, এখন আমরা হৃষ্টচিত্তে ডিম থেরাপির মিমে ফিরে যাচ্ছি, আমাদের এই ইনস্ট্যান্ট জাস্টিসই কি তবে আমাদের রাজনীতির মোক্ষ? প্রতিশোধের রাজনীতি, প্রতিরোধের নয়?

  • ঈদ মোবারক নাসিম

    ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য | প্রকাশিত: 30 মার্চ 2025

    নাসিম, কেমন আছিস?

    আজ ঈদ। ঈদের অকুন্ঠ শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা নিস। আমিও নিলাম। নিয়ে দিয়ে কিছু অতিরিক্ত রয়ে গেলে সেই ভালোবাসায় চল হরির লুট দিই। আমার দিদুন দিতেন তুলসীতলায় দাঁড়িয়ে। তোর নানা সাহেব যেমন যাকাতুল ফিতর দিতেন, রমজানের শেষে।

  • গুরু প্রণাম

    ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য | প্রকাশিত: 30 নভেম্বর 2024

    তেত্রিশ বছর আগের কথা। ক্লাস ফাইভে আমার প্রথম দিন, গরমের ছুটি পড়বে ঠিক তার পরদিন থেকে। নতুন স্কুলেও সেদিনই আমার প্রবেশ, মহারাষ্ট্র থেকে সদ্য এসেছি কলকাতায়, কথায় কথায় হিন্দি মারাঠি 'ঘুসে' যায় তখনও। মা বাবা ভর্তি করে দিলেন স্থানীয় ইশকুলে। রবীন্দ্র বালিকা বিদ্যাপীঠ, বাংলা মাধ্যম, সবুজ স্কার্ট শাদা শার্ট। তবে সেইদিন ছিল রঙ্গিন পোষাকের দিন, গরমের ছুটি পড়ে যাবে এর পর।

  • ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 05 জুলাই 2026

    ডিমেনশিয়া, ব্রেন হ্যামারেজ, হার্ট মনিটর বনাম পার্টিশনের অভিশাপে অধুরা প্রেমকাহিনীর কন্ট্রাস্ট যে এমন নজরকাড়া দেখতে হতে পারে ইমতিয়াজ আলি না দেখালে বিশ্বাস হত না।

    ৯৫ বছর বয়সী ইশার সিং গ্রেওয়াল ওরফে কিনু (নাসিরুদ্দিন শাহ) ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বারবার তাঁর পাকিস্তানের সারগোধায় ফেলে আসা বাড়ি আর কোন এক মালিকা দিলফরেবের কথা বলে যাচ্ছেন। এই ভুলে যাওয়া, এলোমেলো স্মৃতি ছবির আসল ফর্ম। ইমতিয়াজের সিগনেচার নন-লিনিয়ার গল্প বেয়ে আমরা আগু পিছু করতে থাকি।

  • গ্রে স্কেল দুই

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 02 নভেম্বর 2024

    সে ছিল আমাদের সোনালি বিকেলের দিনকাল। সিনেমার হিরোরা বুকের মধ্যে তুফান তুলতেন। হিরোইনরা আঁখিয়োসে গোলি মারতেন। পান সিগারেটের দোকানে নিষিদ্ধ সিনেম্যাগের প্রচ্ছদ থেকে মোহিনী দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকতেন রাংতা পোশাকে জুহি, খালি গায়ে সালমান, হৃদয়ভোলানো হাসিতে মাধুরী, ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জিতে অক্ষয়। বাজিগরের জন্য তখন স্কুলে অনেকেই দিওয়ানা। এইসব বয়ঃসন্ধির ক্রান্তিকালে অনেকেই একটু আধটু মৌলবাদী হয়ে উঠতাম। আমার থাকবে সালমান মাধুরী, আর কেউ না।

  • কালো মেয়ে

    ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য | প্রকাশিত: 25 অক্টোবার 2024

    দুপুরবেলা পড়তে বসে অংকে ভুল হয়ে যায় মেয়ের, মুঠো খানেকের হৃৎপিন্ডে ছলকে ওঠে রক্ত, বেণীমাধবকে দেখে একদৌড়ে সে পালিয়ে যায় ঘরে। বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো, শহুরে, দেখতেও বুঝি রাজপুত্তুরটি।

    কিন্তু, মেয়েটির গায়ের রং যে কালো?