"প্রভু, দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমানে আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।"
বলাই বাহুল্য এসব বলে গান্ধারী কিছুই আটকাতে পারেননি। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, আস্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, কোনও কিছুই এসব ধর্মকথা হাতে নিয়ে বসে থাকেনি। এই যুগের গুরুজনেরা তো বলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেও অর্বাচীন কম নন, তিনি তো আর দেশভাগের ক্রাইসিস দেখেননি! ঐজন্যেই গান্ধারীর আবেদনে অত নীতিকথা লিখেছেন।
তা দেখুন, গুরুজনেরা, বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুজনেরা বলেন যখন ঠিকই বলবেন, তাঁদের বক্তব্যে ভুল ধরতে গেলে ঠিকানা পরিবর্তনের দরকার পড়তে পারে। সেটা কথা নয়। প্রশ্নটা হলো, বাংলায় এনকাউন্টার ফিরে পেয়ে আমরা ভেরি হ্যাপি। মেয়েদের বিচার এসে গেছে, এখন আমরা হৃষ্টচিত্তে ডিম থেরাপির মিমে ফিরে যাচ্ছি, আমাদের এই ইনস্ট্যান্ট জাস্টিসই কি তবে আমাদের রাজনীতির মোক্ষ? প্রতিশোধের রাজনীতি, প্রতিরোধের নয়?
যন্তর মন্তরে আসুন। আমাদের রিয়েল লাইফ র্যাঞ্চো সোনম ওয়াংচুক এক পক্ষকালের বেশি অনির্দিষ্টকালীন অনশনে বসে আছেন। দাবি, NEET-সহ জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তাঁর রক্তচাপ ও সুগার ফল করছে, হাড় বেরিয়ে এসেছে, অর্থাৎ ভিতরে বাহিরে মাসল লস হতে শুরু করেছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তাব আসেনি। নীরবতাই সরকারি নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিডিয়ার এই নিয়ে শেষ মাথা ব্যথা দেখা গিয়েছিল পনের বছর আগে, আন্না হাজারের অনশনের সময়। তারপর মিডিয়ার মাথাটাই পাল্টে গিয়েছে। তাই খবরের শিরোনামে বিরাজ করছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এনকাউন্টার-ভিত্তিক পুলিশি “সাফল্য”, আমরা চেটেপুটে ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস সেলিব্রেট করছি। একই রাষ্ট্র, একই টাইমলাইন, কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। তাহলে রাষ্ট্র কোন ধরনের রাজনৈতিক ভাষাকে পুরস্কৃত করতে বেছে নেয়, আর কেন?
পণ্ডিতেরা এই সময় কানে কানে বলেন, ফলো দ্য মানি।
অ্যাটেনশন ইকোনোমি বস্তুটার দিকে নজর দিলে কী দেখতে পাই? আসুন সকালে জমা বিকেলে খরচের দিকে দেখি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার ভাষা হলো এনকাউন্টার। তাৎক্ষণিক, সিনেম্যাটিক, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে “কড়া প্রশাসক” হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেয়, ধীর বিচার, দুর্বল তদন্ত এইসব পচা ঘা আড়াল করে দেয়। এই যে খরচ এর দায় ভুক্তভোগীর ওপর বর্তায়, রাষ্ট্রের ওপর নয়। আর ইয়ে, খরচা হয়ে যেতে একটু বেশি গরিব, একটু কম মাতব্বর হতে লাগে (পড়ুন প্রভাস মণ্ডল), অতএব জবাবদিহিতার সামাজিক চাপও ন্যূনতম। কেন বারুইপুরে মাদক ব্যবসার রমরমা, কোন কোন মাথা এইভাবে শিশুদের শরীর টার্গেট করে বসে আছে, কার নিদান পেয়ে অভিযুক্তদের অধরা রেখেছিল প্রশাসন, এর উত্তরে আর কেউ ইন্টারেস্টেড নয়, ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস যেহেতু এসেই গিয়েছে।
এর উল্টোদিকে প্রতিবাদের ভাষা, যেমন অনশন, ধরনা, মিছিল। ধীর, নৈতিক, স্বচ্ছ, কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো খরচ চাপায় না যদি না সেটা নির্বাচনী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়। খরচের দায় সম্পূর্ণ প্রতিবাদকারীর ওপর বর্তায়। যেমন সোনম ওয়াংচুকের মাসল খরচ। কুড়ি জন NEET পরীক্ষার্থীর জীবন। খরচ কার? যার গেল, শুধুই তার, তাই তো?
আরেকবার তাকান অ্যাটেনশন ইকোনমির দিকে। কোন অপরাধে খরচ হবে? যে অপরাধ মিডিয়ার গ্রাফিক ডিটেলসের যোগ্য। বালিকার ফুসফুসে কাদাজল, পাকস্থলীতে ভাত, শরীরে কামড় এগুলো যে ভয়ানক জনরোষ তৈরি করতে পারে, পরীক্ষার দুর্নীতি কিংবা প্রশাসনের গাফিলতি তার ধারে কাছেও আসে না। কাজেই খরচের দায় NEET কেলেঙ্কারিতে কেবল প্রতিবাদীর, কারণ ওতে জনরোষ জমা হয়েছে কম।
এখন আপনি বলবেন খরচ হচ্ছে হোক, কেউ তো শাস্তি পেল? মেয়েদের দিকে তাকানোর আগে ধর্ষক একটু ভাববে, দাবাং পুলিশ আর নায়ক মুখ্যমন্ত্রী এসে খরচ করে দেবেন, সেই ভয়ে। অ্যাটেনশন ইকোনমির আক্কেল এখানেই বেরিয়ে আসে। যেহেতু অঞ্জন চৌধুরীর স্ক্রিপ্ট মেনে এ দেশের রাজনীতি চলে না, এনকাউন্টার বাড়িয়ে ধর্ষণ রোখাও যায় না। না, আমি বলছি না, সংখ্যাতত্ত্ব বলছে। উত্তরপ্রদেশ ধরে চলা যাক। এনকাউন্টারের রোল মডেল রাজ্য, NHRC-র ডেটাবেস অনুযায়ী সারা দেশে সবমিলিয়ে ১৯৯৭ সাল থেকে ৩,৫৮৪ জন শুটআউটে মারা গেছেন, যার মধ্যে একা উত্তরপ্রদেশেই ১,১১৪ জন, জাতীয় সর্বোচ্চ। ওকে? এবারে একটু জেনানা মহলে দেখি। এত এনকাউন্টার, মেয়েদের গায়ে হাত তোলার আগে দশবার ভাবছে নিশ্চয়ই ধর্ষক? কিন্তু হুজুর, ২০২২-এ নারীর বিরুদ্ধে সার্বিক অপরাধে উত্তরপ্রদেশ শীর্ষে ৬৫,৭৪৩ কেস নিয়ে, তারপর মহারাষ্ট্র (৪৫,৩৩১), তারপর রাজস্থান (৪৫,০৫৮)। POCSO (শিশু যৌন নির্যাতন) কেসেও একই প্যাটার্ন, উত্তরপ্রদেশ (৭,৯৫৫) জাতীয় শীর্ষে। ২০২৪ সালের তথ্য বলছে ধর্ষণ মামলায় সর্বোচ্চ স্থান রাজস্থান (৪,৮৭১), তার পরেই ইউপি, মোট ৩,২০৯ টি ধর্ষণের মামলা।
তাহলে শেষমেশ কী দাঁড়ালো? জনমত ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস পেয়ে খুশি, কিন্তু তাতে আরেকটা বারুইপুর আটকানোর ব্লু প্রিন্ট কোথাও তৈরি হচ্ছে না। এও দাঁড়ালো, যে জনমত সেখানেই জাস্টিস চাইবে যেখানে অত্যাচার দেখা যায়, অ্যাটেনশন তৈরি হয়। যে অত্যাচার কামড়, আঁচড় দিয়ে দেখা যায় না, তাই নিয়ে আমাদের কোনও হেলদোল থাকবে না। বেকার, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ছেলেদের ড্রাগ, মদ, মেয়েছেলে দিয়ে গ্যাং বানানোর বিরুদ্ধে আমাদের বিশেষ বোল ফুটবে না। পেপার লিক হওয়ার ক্ষোভে আত্মহত্যা আমাদের তেমনটা রাগিয়ে দেবে না। শুধু ক্ষত বিক্ষত লাশ দেখলে আমরা একটা মরা মুখ দেখতে চাইব।
আমাদের প্রতিহিংসার রাজনীতির প্রতি এই দুর্বার প্রেম একটা দারুণ কাজ করেছে। আমাদের চোখের সামনে ডেমোক্রেসি ডিমোক্রেসি হয়ে উঠেছে। বিচারবহির্ভূত সহিংসতা “দক্ষতা” হিসেবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, অথচ বৈধ, সাংবিধানিক প্রতিবাদকে ক্রমাগত উপেক্ষা করার সাহস পেয়েছে রাষ্ট্র। সরকার নিজেই বার্তা দিতে পারছে যে বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ “কাজ করে” আর বৈধ প্রতিবাদ “করে না”। আর আমরা নাগরিকরা একটা গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা পাই: দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পথ ফেল, আর দৃশ্যমান সহিংসতাই পাশ। জবাবদিহিতার দায় আর থাকছে না।
অবশ্য জবাব চাইবে কে? ঠিকানা পরিবর্তন হবার ভয় নেই? এদিকে যন্তর মন্তরে ধুঁকছেন সোনম ওয়াংচুক। তিনি না খেয়ে মরে গেলে কি একটা জনমত তৈরি হবে? ইনস্ট্যান্ট জাস্টিসের বিকল্প বেছে নেবার জন্য কি এ দেশের আর একটা লাশই লাগবে? নাকি না খেয়ে মরে যাওয়া একটা দেহ এ দেশে অতটাও গ্রাফিক ডিটেইলস দিতে পারবে না? না খেয়ে এ দেশে কি কম লোক মরে?
অ্যাটেনশন ইকোনোমি আর কতদূর নিয়ে যাবে আমাদের?