Select your language

কথকতার ছলে জীবনের গল্প বলে মেয়েদের দল Mad Balikas
পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 05 জুলাই 2026
ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা

ডিমেনশিয়া, ব্রেন হ্যামারেজ, হার্ট মনিটর বনাম পার্টিশনের অভিশাপে অধুরা প্রেমকাহিনীর কন্ট্রাস্ট যে এমন নজরকাড়া দেখতে হতে পারে ইমতিয়াজ আলি না দেখালে বিশ্বাস হত না।

৯৫ বছর বয়সী ইশার সিং গ্রেওয়াল ওরফে কিনু (নাসিরুদ্দিন শাহ) ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বারবার তাঁর পাকিস্তানের সারগোধায় ফেলে আসা বাড়ি আর কোন এক মালিকা দিলফরেবের কথা বলে যাচ্ছেন। এই ভুলে যাওয়া, এলোমেলো স্মৃতি ছবির আসল ফর্ম। ইমতিয়াজের সিগনেচার নন-লিনিয়ার গল্প বেয়ে আমরা আগু পিছু করতে থাকি।

এই ন্যারেটিভ কেবল কাব্যিক নয়, বিপজ্জনক। বুড়ো কিনু প্রলাপ বকে যায়, মঙ্গল গ্রহ থেকে ভিনগ্রহী এসে তার চাঁদে হানা দিচ্ছে। আমরাও দাঁত বার করে হাসতে হাসতে দেখি থোকা থোকা ফুলের ঝোপে ঢাকা লাল গোলাপি বাড়ির এক আশ্চর্য সারগোধায় ছোকরা কিনু আফসানাকে লাইন মারছে। চাঁদ। বাইরে থেকে বালোচ পাঠান গুন্ডা এনে দাঙ্গা করানোর আতঙ্ক গুজগুজ ফিসফাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মার্স। অমঙ্গল।

এই গল্পবলার একটা দারুণ মজা আছে। পার্টিশন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দায় এড়ানো ঔদাসীন্য আমরা স্ট্যান্ড আপ কমেডির হিহি হাহা দিয়ে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করি। তার পরেই ঝাঁকুনি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাই শিখ মেয়েদের গণধর্ষণের রেড সিনে। ক্যামেরা এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঠাকুমার (ডলি আলুওয়ালিয়া) দিকে, তিনি নিজের হাতে একের পর এক শিশু, কিশোরী, সদ্য যৌবনাদের গলা কাটেন, যাতে তারা বিধর্মীদের নির্যাতিতা হয়ে না মরে। ক্যামেরা সরে না, যতক্ষণ না দেখতে দেখতে আশ্বস্ত হই মেয়েগুলো মরে বাঁচল ভেবে। ভিক্টোরিয়ান সভ্যতা আমাকে পার্টিশনের সাত দশক পেরিয়েও ভাবতে দেয় না এই মেয়েগুলো হাতে দা কাটারি নিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারত, মেরেই না হয় মরত।
ট্র্যাজেডি সম্পূর্ণ হয়।

বুড়ো কিনু কি প্রলাপ বকছিল আদৌ? মঙ্গলগ্রহের কথা কি এই জন্যেই তোলা? পৃথিবীর মানুষ কেন এমন নৃশংস হবে? শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিম ন্যারেটিভ দিয়ে ব্যাখ্যা হয় এই হিংস্রতার?

নাহ, এই সিনেমা এইসব তর্কে যায়নি। বরং ফ্ল্যাশব্যাকের গোলাপি, সেপিয়া, লাল বা মনোক্রম সাদা কালোয় বুনেছে রূপকথার প্রেমের গল্প, কিশোরী আফসানার চাঁদবালির গল্প, আপ্রাণ কবি হতে চাওয়া কিশোর কিনুর গল্প। আর স্মৃতির ভুলভুলাইয়ার বাইরে চলতে থাকে ক্লোজার খোঁজার গল্প। কিনুর কোন কথাটা না বলা থেকে গেছে যে তার মরে যাওয়াও হচ্ছে না? কিনুর নাতি (দিলজিৎ দোসাঞ্জ) কর্পোরেট লাইফ থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে আসে ঠাকুরদার ক্লোজারের খোঁজে, তার নিজের কিছু উত্তরও ফাউ মিলে যায়।

দাঙ্গা, ধর্ষণের গল্প বলতে বসা মানে প্রোপাগান্ডা করা নয়, মুসলমানদের সব দোষ বলে হাত ধুয়ে ফেলা নয়। রিফিউজি হওয়ার অভিশাপ মঙ্গল গ্রহ নয়, এই গ্রহেরই মানুষজন বিলক্ষণ জানেন। সিনেমা শেষ হলে আর ফ্লাইট ল্যান্ড করলে ভারতীয়রা প্রবল ছটফট করতে থাকেন। তাই অনেকেই এন্ড ক্রেডিট সিনে 'ক্যায়া কামাল হ্যায়' (এ.আর. রহমান-দিলজিৎ দোসাঞ্জ-ইরশাদ কামিল) মিউজিক ভিডিওটা মিস করে গেছেন। ব্যস্ত দর্শকের চলে যাবার ফাঁক দিয়ে দেখলাম ভিডিওর মধ্যে বিভিন্ন সময়কাল আর দেশের আর্কাইভাল ফুটেজ আছে, যার মধ্যে গাজা, বেইরুটের ঘরবাড়ি মিশে যাবার দৃশ্যও আছে। কিনুর রূপকথার পর এই গান দেশভাগকে আজকের টাইমলাইনের সঙ্গে জুড়ে দেয়, দেশভাগের ট্রমাকে বিচ্ছিন্ন একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার একটা চলমান, সার্বজনীন রিয়ালিটি হিসেবে দেখিয়ে ফেলে। আর আমাদের সেই সব সর্বনাশ নিউ নরমাল ধরে মেনে নেবার অভ্যেস ক্যায়া কামাল হ্যায় হয়ে ওঠে।

ধন্যবাদ জানবেন ইমতিয়াজ, দেশভাগের সময়ের এমন রূপকথা এই সময়ে দাঁড়িয়ে বোনার জন্য, আর আপাদমস্তক পাঞ্জাবি পরিবারের ক্রাইসিসে দু কলি বাংলা গান রাখার জন্য। এ আর রহমানের অতীব খারাপ মিউজিকের জন্য আর কোনও ক্ষোভ নেই। আপনি সত্যিই কামাল করেছেন!

আপনার মতামত

এর উত্তরে Some User

এই বিভাগের অন্যান্য পোস্টসমূহ

  • কালো মেয়ে

    ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য | প্রকাশিত: 25 অক্টোবার 2024

    দুপুরবেলা পড়তে বসে অংকে ভুল হয়ে যায় মেয়ের, মুঠো খানেকের হৃৎপিন্ডে ছলকে ওঠে রক্ত, বেণীমাধবকে দেখে একদৌড়ে সে পালিয়ে যায় ঘরে। বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো, শহুরে, দেখতেও বুঝি রাজপুত্তুরটি।

    কিন্তু, মেয়েটির গায়ের রং যে কালো?

  • গ্রে স্কেল দুই

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 02 নভেম্বর 2024

    সে ছিল আমাদের সোনালি বিকেলের দিনকাল। সিনেমার হিরোরা বুকের মধ্যে তুফান তুলতেন। হিরোইনরা আঁখিয়োসে গোলি মারতেন। পান সিগারেটের দোকানে নিষিদ্ধ সিনেম্যাগের প্রচ্ছদ থেকে মোহিনী দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকতেন রাংতা পোশাকে জুহি, খালি গায়ে সালমান, হৃদয়ভোলানো হাসিতে মাধুরী, ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জিতে অক্ষয়। বাজিগরের জন্য তখন স্কুলে অনেকেই দিওয়ানা। এইসব বয়ঃসন্ধির ক্রান্তিকালে অনেকেই একটু আধটু মৌলবাদী হয়ে উঠতাম। আমার থাকবে সালমান মাধুরী, আর কেউ না।

  • ঈদ মোবারক নাসিম

    ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য | প্রকাশিত: 30 মার্চ 2025

    নাসিম, কেমন আছিস?

    আজ ঈদ। ঈদের অকুন্ঠ শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা নিস। আমিও নিলাম। নিয়ে দিয়ে কিছু অতিরিক্ত রয়ে গেলে সেই ভালোবাসায় চল হরির লুট দিই। আমার দিদুন দিতেন তুলসীতলায় দাঁড়িয়ে। তোর নানা সাহেব যেমন যাকাতুল ফিতর দিতেন, রমজানের শেষে।

  • আহু দারিয়েই

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 07 নভেম্বর 2024

    আহু দারিয়েই বলে আসলে কিছু নেই।

    বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনি বলবেন ভাইরাল হয়েছিলেন আহু দারিয়েই। আপনি বলবেন হিজাব ছাড়া দুই সন্তানের জননী আহু দারিয়েই তেহরানের ইসলামী আজাদ ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছিলেন। পর্দা না করার মত গুনাহ ওখানকার মাতব্বরেরা মোটেও কবুল করেননি। তাঁরা এসে তরুণীকে উত্তম মধ্যম দিয়ে তার ঊর্ধ্বাঙ্গের পোষাক কেড়ে তাঁকে ক্ষমা করে ছেড়ে দেন।

  • মিডডে মিল

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 28 জুন 2026

    ঘটনা নব্বই-একানব্বই সালের। সেদিন গার্জেনদের ডেকেছিলেন রেবাদি। তখনও তিনি ব্রহ্মচারিণী রেবাদি, সারদা আশ্রমের হেডমিস্ট্রেস। ছোটো করে বড়দি। প্রব্রাজিকা সারদাপ্রাণা হবেন আরও কয়েক বছর পর। ছোটোখাটো চেহারার শান্তশিষ্ট মানুষটি ভয়ানক ব্যক্তিত্ব নিয়ে এসে দাঁড়ালে ক্লাসশুদ্ধু দামাল মেয়েরা শান্ত হয়ে যেত, তাদের বাবা মায়েদের কথাই আলাদা। তো সেদিন বড়দি মেয়েদের গার্জেনদের ডেকে বললেন বাচ্চাদের ভালো করে খেতে দেবেন। একটা ডিমসেদ্ধ অন্তত দেবেন। মর্নিং সেকশন, সকালের খিদে নিয়ে পড়তে পারবে না। কয়েকজন মা কুঁইকুঁই করে বললেন এত সকালে মেয়েদের দুধ বিস্কুট ছাড়া কিছু খাওয়ানো যায় না। বাস্তবিক, ওয়ান থেকে ফোর আমাদের সকাল ছটা দশের মধ্যে ঢুকে যেতে হত। সকালে ভারি ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব ছিলো। বড়দি ভুরু কুঁচকে বললেন, “টিফিনে দিয়ে দেবেন। ওদের ডিম দেবেন, পেট যেন ভর্তি থাকে।”

    অকুস্থলে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন, যেমন আমার মা। 

  • গ্রে স্কেল চার

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 24 জুলাই 2025

    সেও এক দিন ছিল!

    ষাটের শেষ, কিংবা সত্তরের শুরু। উঠতি বয়সের সিড়িঙ্গে এক ছোকরা চায়ের দোকানে বিড়ি ফুঁকছে। যেমন ধারালো মুখ তেমন ধারালো জিভ। ফাঁকিবাজ আবার পরোপকারী বলে দুর্নাম। এর বাপকে নালিশ দেবার সাহস কার আছে? মহেশ বাঁড়ুয্যে ডাকসাইটে পণ্ডিত। মামুলি সরকারী চাকুরে হতেই পারেন, কিন্তু খড়ম, সংস্কৃত আর অঙ্কে গায়ত্রী জপেন। তাঁর মেজ ছেলে এমন মারকুটে দুর্মুখ ধারা কোথা থেকে পেলে কেউ জানে না।

  • গ্রে স্কেল তিন

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 27 ডিসেম্বর 2024

    টেলিভিশন জিনিসটা যারা আটের দশকে জন্মেছে তাদের জন্য একটা আস্ত জীবন্ত রূপকথা ছিল। এই কর লো দুনিয়া মুঠ্ঠি মে র অনেক আগের দিনকাল সেসব। আমার গল্পটা বলি, জানি এমন গল্প আছে এ দেশের অনেক প্রৌঢ় পাড়ায় পাড়ায়। তখন সদ্য সদ্য একটা আধটা মধ্যবিত্ত বাড়িতে ঢুকছে সাদা কালো টেলেরামা। রামানন্দ সাগরের ডিরেকশনে দারা সিং নতজানু হয়ে বসে বুক চিরে দেখাচ্ছেন রাম সীতার ছোট্ট পোস্টকার্ড সাইজ ছবি।

  • চা

    পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রকাশিত: 21 মে 2024

    কেটলিতে আধহেমন্তের সকাল বুড়বুড়ি কাটছে। ঐ ঘাড়ে ঘাড়ে জোলো দুধ আর চিনির ডেলা পড়ল। রং দেখ, যেন সাক্ষাৎ মে মাসের দুপুর। সামান্য শিউরে উঠলেন সাঁপুইবাবু। হাতে হাতে পাচার হয়ে যে ভাঁড়টা এসে পৌঁছল তার খোঁদলে উষ্ণ তরলের ওপর পুরু সর। তাও মুখ দেখার ব্যর্থ চেষ্টা তিনি করবেনই। রোজকার মতন। রিফ্লেক্স।