ডিমেনশিয়া, ব্রেন হ্যামারেজ, হার্ট মনিটর বনাম পার্টিশনের অভিশাপে অধুরা প্রেমকাহিনীর কন্ট্রাস্ট যে এমন নজরকাড়া দেখতে হতে পারে ইমতিয়াজ আলি না দেখালে বিশ্বাস হত না।
৯৫ বছর বয়সী ইশার সিং গ্রেওয়াল ওরফে কিনু (নাসিরুদ্দিন শাহ) ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বারবার তাঁর পাকিস্তানের সারগোধায় ফেলে আসা বাড়ি আর কোন এক মালিকা দিলফরেবের কথা বলে যাচ্ছেন। এই ভুলে যাওয়া, এলোমেলো স্মৃতি ছবির আসল ফর্ম। ইমতিয়াজের সিগনেচার নন-লিনিয়ার গল্প বেয়ে আমরা আগু পিছু করতে থাকি।
এই ন্যারেটিভ কেবল কাব্যিক নয়, বিপজ্জনক। বুড়ো কিনু প্রলাপ বকে যায়, মঙ্গল গ্রহ থেকে ভিনগ্রহী এসে তার চাঁদে হানা দিচ্ছে। আমরাও দাঁত বার করে হাসতে হাসতে দেখি থোকা থোকা ফুলের ঝোপে ঢাকা লাল গোলাপি বাড়ির এক আশ্চর্য সারগোধায় ছোকরা কিনু আফসানাকে লাইন মারছে। চাঁদ। বাইরে থেকে বালোচ পাঠান গুন্ডা এনে দাঙ্গা করানোর আতঙ্ক গুজগুজ ফিসফাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মার্স। অমঙ্গল।
এই গল্পবলার একটা দারুণ মজা আছে। পার্টিশন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দায় এড়ানো ঔদাসীন্য আমরা স্ট্যান্ড আপ কমেডির হিহি হাহা দিয়ে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করি। তার পরেই ঝাঁকুনি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাই শিখ মেয়েদের গণধর্ষণের রেড সিনে। ক্যামেরা এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঠাকুমার (ডলি আলুওয়ালিয়া) দিকে, তিনি নিজের হাতে একের পর এক শিশু, কিশোরী, সদ্য যৌবনাদের গলা কাটেন, যাতে তারা বিধর্মীদের নির্যাতিতা হয়ে না মরে। ক্যামেরা সরে না, যতক্ষণ না দেখতে দেখতে আশ্বস্ত হই মেয়েগুলো মরে বাঁচল ভেবে। ভিক্টোরিয়ান সভ্যতা আমাকে পার্টিশনের সাত দশক পেরিয়েও ভাবতে দেয় না এই মেয়েগুলো হাতে দা কাটারি নিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারত, মেরেই না হয় মরত।
ট্র্যাজেডি সম্পূর্ণ হয়।
বুড়ো কিনু কি প্রলাপ বকছিল আদৌ? মঙ্গলগ্রহের কথা কি এই জন্যেই তোলা? পৃথিবীর মানুষ কেন এমন নৃশংস হবে? শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিম ন্যারেটিভ দিয়ে ব্যাখ্যা হয় এই হিংস্রতার?
নাহ, এই সিনেমা এইসব তর্কে যায়নি। বরং ফ্ল্যাশব্যাকের গোলাপি, সেপিয়া, লাল বা মনোক্রম সাদা কালোয় বুনেছে রূপকথার প্রেমের গল্প, কিশোরী আফসানার চাঁদবালির গল্প, আপ্রাণ কবি হতে চাওয়া কিশোর কিনুর গল্প। আর স্মৃতির ভুলভুলাইয়ার বাইরে চলতে থাকে ক্লোজার খোঁজার গল্প। কিনুর কোন কথাটা না বলা থেকে গেছে যে তার মরে যাওয়াও হচ্ছে না? কিনুর নাতি (দিলজিৎ দোসাঞ্জ) কর্পোরেট লাইফ থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে আসে ঠাকুরদার ক্লোজারের খোঁজে, তার নিজের কিছু উত্তরও ফাউ মিলে যায়।
দাঙ্গা, ধর্ষণের গল্প বলতে বসা মানে প্রোপাগান্ডা করা নয়, মুসলমানদের সব দোষ বলে হাত ধুয়ে ফেলা নয়। রিফিউজি হওয়ার অভিশাপ মঙ্গল গ্রহ নয়, এই গ্রহেরই মানুষজন বিলক্ষণ জানেন। সিনেমা শেষ হলে আর ফ্লাইট ল্যান্ড করলে ভারতীয়রা প্রবল ছটফট করতে থাকেন। তাই অনেকেই এন্ড ক্রেডিট সিনে 'ক্যায়া কামাল হ্যায়' (এ.আর. রহমান-দিলজিৎ দোসাঞ্জ-ইরশাদ কামিল) মিউজিক ভিডিওটা মিস করে গেছেন। ব্যস্ত দর্শকের চলে যাবার ফাঁক দিয়ে দেখলাম ভিডিওর মধ্যে বিভিন্ন সময়কাল আর দেশের আর্কাইভাল ফুটেজ আছে, যার মধ্যে গাজা, বেইরুটের ঘরবাড়ি মিশে যাবার দৃশ্যও আছে। কিনুর রূপকথার পর এই গান দেশভাগকে আজকের টাইমলাইনের সঙ্গে জুড়ে দেয়, দেশভাগের ট্রমাকে বিচ্ছিন্ন একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার একটা চলমান, সার্বজনীন রিয়ালিটি হিসেবে দেখিয়ে ফেলে। আর আমাদের সেই সব সর্বনাশ নিউ নরমাল ধরে মেনে নেবার অভ্যেস ক্যায়া কামাল হ্যায় হয়ে ওঠে।
ধন্যবাদ জানবেন ইমতিয়াজ, দেশভাগের সময়ের এমন রূপকথা এই সময়ে দাঁড়িয়ে বোনার জন্য, আর আপাদমস্তক পাঞ্জাবি পরিবারের ক্রাইসিসে দু কলি বাংলা গান রাখার জন্য। এ আর রহমানের অতীব খারাপ মিউজিকের জন্য আর কোনও ক্ষোভ নেই। আপনি সত্যিই কামাল করেছেন!