ভূমিকা
গল্পটা আমাদের মোটামুটি চেনা। ইতিহাস বইয়ে বিনয় বাদল দীনেশের অলিন্দ যুদ্ধের আখ্যান পড়েনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ ব্রিটিশ রাজ যে তাঁদের দেগে দিচ্ছে আর্বান ডাকাত বলে, তা খুব একটা জানা কথা নয়। বিনয় বোস যখন গুলি খেয়ে হাসপাতালে, কমিশনার টেগার্ট সশরীরে গিয়ে বিনয় বোসকে দর্শন দিয়ে এলেন। পরের দিন দেখা গেল বিনয়ের আঙুলের গাঁটগুলো সব ভাঙা।
অগ্নিযুগে বিপ্লবের জানা-অজানা কাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারের দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি শ্রুতিনাটক টেগার্টের ডায়েরি। চ্যাপ্টার ১ নির্মিত হয়েছে বিনয়-বাদল-দীনেশের রাইটার্স অভিযানের ওপরে। শ্রুতিনাটকের কিছু সংলাপ এখানে রইল।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
টেগার্ট
8th December 1930, আমার ত্রিশ বৎসরের কর্মজীবনে একটি কলঙ্কময় দিন। হ্যাঁ, আমি নেটিভদের এই ভাষাতেই লিখব। নো ম্যাটার হাউ মাচ আই লোদ দোজ মঙ্গরেলস, আই মাস্ট। আমাদের যা কিছু ভুলচুক ছিল তার শাস্তি হিসাবেই আমাকে লিখতে হবে।
দীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের পুলিশের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে এই নেটিভ বেঙ্গলী টেররিস্টদের অক্ষম, দুর্বল মনে করা কতটা নৈতিক ভুল। আমরা পাবলিক অফিশিয়ালরা যতই বাইরে লেকচর দিয়ে বেড়াই যে এরা এক্সট্রিমিস্ট, আ নিউ বাঞ্চ অফ আরবান ঠাগস, ভেতরে ভেতরে আমরা জানি গোড়াতেই এদের শিরদাঁড়া ভেঙে না দিলে এই কালা কুত্তাগুলো নিজেদের আইরিশ বিপ্লবী ভেবে বসবে, একদিন ঐ নোংরা হাতে নামিয়ে আনবে আমাদের পবিত্র ইউনিয়ন জ্যাক। আমি তাই এক্সেমপ্লেরি পানিশমেন্টে বিশ্বাস করি। জুরি পর্যন্ত যাবার আগেই চাবকে পিঠের ছাল তুলে দিলে বিপ্লবের দাঁতটা ভালো করে ভাঙা যায় বলেই আমার বিশ্বাস। অলসো আ ডিপ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ইস আ মাস্ট l আমাদের পুলিশকর্তারা হঠাৎ আত্মসন্তুষ্টিতে না ভুগলে বিনয় বাদল দীনেশের গ্যাং এতগুলো অফিশিয়ালের প্রাণ নিতে পারত না।
ঘটনার পর চিরুনী তল্লাশি চালিয়ে যা যা তথ্য পেয়েছি তা জোড়া লাগিয়ে আমি আজ স্তম্ভিত। এই কালা কুত্তাগুলো আমাদের হাজার চোখকে এতখানি ফাঁকি দিতে পারে এ আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আওয়ার ইন্টেলিজেন্স ফেল্ড. যতই যন্ত্রণা হোক ভাবতে আমি প্রথম থেকে গোটাটা আন্দাজ করে লিখব আজ। অ্যাস আ রেকর্ড ফর মাই সাকসেসর্স ইন ক্যালকাটা পুলিস, দিস উইল বি অ্যান একাউন্ট ফ্রম মি , কমিশনার চার্লস টেগার্ট।
29th August 1930, ডালহৌসী স্কোয়ারের আমার গাড়িতে বোমা ছোঁড়ার ঠিক চারদিন পরে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে খুন হয়ে গেল ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিস মিস্টার এফ জে লোম্যান. সন্ত্রাসীদের জেলের মধ্যে কেমন করে আদর করতে হয় লোম্যান ছিল তার পাইওনিয়ার। সঙ্গে প্রাণ হারাল ঢাকার সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিস মিস্টার ই হাডসন। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাধানোর মেশিনারি ছিল হাডসনের হাতের মুঠোয়। বেঙ্গল পুলিশের এই দুই রত্নকে দিনে দুপুরে খুন করল একটা ছোকরা। মেডিকেল কলেজের ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট, বিনয় বোস।
বিনয় বোসের মাথার দাম পাঁচ টাকা থেকে দশ হাজারে উঠেছিল। তাকে ধরতে রেলষ্টেশন থেকে স্টীমার অবধি ফাঁদ পাতা। তাও ঢাকা থেকে কলকাতা দিব্যি চলে এল সে। পুলিশকর্তারা ইঁদুর ধরার ফাঁদ পেতেছিলেন। বিনয় বোস ছিল নরখাদক বাঘ।
বাদল গুপ্ত আর দীনেশ গুপ্তের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না। কিন্তু এরা হল বর্ন ক্রিমিনাল, ইউনিয়ন জ্যাকের বিরুদ্ধে মাথা তুলে পিস্তল উঁচিয়ে ধরার স্পর্ধা এদের মজ্জাগত।
বেশ ভাবতে পারি উত্তর কলকাতার কোনো এক বাড়িতে এরা জমায়েত হয়েছিল, অপারেশন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের জন্য।
(ফেড আউট)
দৃশ্য ১
দীনেশ - এই বিনয়দা, কাপ্তেন সত্যেন বোসকে তুমি কেবল একটাই ঘুষি মেরেছিলে? সত্যি?
বাদল - গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিল নাকি তোমার?
বিনয় - ধুস। মশা মাছি মারতে কে পিস্তল চালায়? লোম্যানকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে ও পা আগে না ভুঁড়ি আগে করতে করতে এসে আমাকে ভাল্লুকের মত জাপটে ধরল। দিলাম চোয়ালে এক ঘুষি।
বাদল - ওর চোয়াল খুলে গেছে শুনেছি। দলের ছেলেরা ঠিক করেছে চোয়াল জোড়া লাগলে আবার ভেঙে দিয়ে আসবে।
দীনেশ - ওদের বোলো মারধর না করে ওকে শেক্সপিয়র সংস্কৃতে অনুবাদ করতে দিতে। চোয়ালের সঙ্গে বাকি দাঁতগুলোও খুলে যাবে। এই বিনয়দা, আরেকটু মাংস নাও?
বিনয়: এই তোরা কী শুরু করেছিস বল দেখি? বড় অপারেশন, এত খেলে শরীর ভারী হয়ে যাবে তো?
বাদল: বা রে, না খেলে দুর্বল হয়ে পড়ব যে! এই দীনেশদা, আমার মাংসের বাটিটা এদিকে দাও দেখি।
দীনেশ : উঁহুহুঁ, ঐদিকে ডেকচিতে আছে একটু ওখান থেকে নাও। আমার পাত থেকে মাংস নেওয়া আর টেগার্টের পেটে কাতুকুতু দিয়ে পালিয়ে আসা এক জিনিস
বাদল : ধুর। দেখি তো। আরিব্বাস ডিমসেদ্ধ ঢাকা দেওয়া
দীনেশ : কৈ দেখি দেখি, সে কি, আমার চোখে পড়েনি তো!
বাদল : অ্যাই খবরদার, আমার ডিমসেদ্ধ হাতাতে এলে কিন্তু ভালো হবে না দীনেশদা।
বিনয় : তোরা কি শুরু করলি। আস্তে!
দীনেশ : তুমি আর কি বুঝবে বিনয়দা, ফলের রস আর দুটো রুটি ঠুকরে যাচ্ছ একঘন্টা ধরে, যোগী মানুষ তুমি। দিলি না তো ডিম, বেশ, কার্তুজ কম পড়লে চাস, দেব তখন দেখবি।
বাদল : কার্তুজ কম পড়লে বিনয়দা দেবে। ওর তো ঘুষিই যথেষ্ট। জাস্ট ইমাজিন হিম ইউজিং সিম্পসন অ্যাস আ পাঞ্চিং ব্যাগ।
দীনেশ : খুব কঠিন দৃশ্যকল্প। এটা কি পোলাও? একটু মুড়ি পেলে মাংস দিয়ে কিন্তু তরিবত হত।
বিনয় : এই দীনেশ, থাম। নিকুঞ্জদা শুনতে পেলেই এখন মুড়ি আনতে দৌড়বে। বেচারি কাল থেকে বাজার করে চলেছে তোদের ফীস্টের জন্য।
দীনেশ : শুধু নিকুঞ্জদা? বৌদি সেই ভোররাত থেকে রেঁধেই চলেছে। কত বললাম মাংসটা আমি রাঁধছি, বলল মন দিয়ে বিপ্লব কর, মাংসটাকে রেহাই দাও।
বাদল : রাইটার্সে মুড়ির কালোবাজারি ডিপার্টমেন্ট আছে শুনেছি। সিম্পসনকে ঠুকে দিয়ে তুমি ওদিকে ঢুকে যেও বরং।
বিনয়: টেগার্ট কলকাতায় নেই। হোয়াট আ পিটি! থাকলে আজ রাইটার্স মিশনে মোলাকাত হত নিশ্চয়ই। ওর ছুঁচোগুলো তো স্টেশনে থিকথিক করছিল দেখলাম।
বাদল: তুমি মাইরি গুরুদেব লোক। ঢাকা থেকে এতদূর চলে এলে এত পাহারা এড়িয়ে? নিকুঞ্জদার কথামত তুমি যদি সত্যিই ইতালি যেতে দেখতে পেতাম মুসোলিনীর ডাইনিং টেবিলে বসে জুস খাচ্ছ।
দীনেশ: ইতালিতে ভালো পচা আঙুরের রস পাওয়া যায়। অবশ্য বিনয়দা ভালো ছেলে…
বিনয়: হাহা, আমি যে লক্ষ্মী মায়ের লক্ষ্মী ছেলে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বিধু দারোগাও তেমনটাই বললেন
বাদল: বিধু দারোগাটা আবার কে?
বিনয়: আরে ময়মনসিংহের বিধু দারোগার নাম শুনিসনি? উনি জগন্নাথ ঘাটে বিনয় বোসকে ধরতে যাচ্ছিলেন। হাটের ব্যামো তো, মাদুলী, তাবিজেও নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। রেলের কামরায় কনস্টেবল ভালো করে তামাক সাজতে পারেনা বলে কানমলা খাচ্ছিল, এই বদিরুদ্দিন মিঞা গিয়ে তামাক সেজে ওনাকে একটু নিশ্চিন্ত করল।
বাদল: তুমি পারো বটে বিনয়দা। দশ হাজার টাকা মাথার দাম নিয়ে দারোগার সঙ্গে আলাপ করতে গেলে?
বিনয়: আরে মাথার দাম আর মাথা! আজ আছে কাল নেই। কিন্তু ওনার মুখে বিনয় বোসের সুখ্যাতি শোনার লোভ সংবরণ করতে পারলে তো সন্ন্যাসী হয়ে যেতুম।
বাদল: খুব প্রশংসা শুনলে?
বিনয়: খুব, খুব! বন্দুক পিস্তলের থেকেও উনি বিনয় বোসের ঘুষির জোর নিয়ে বেশি চিন্তিত দেখলাম। সুভাষ বোসের সঙ্গে দুইবার গুলিয়েও ফেললেন। ক্ষমতা থাকলে ওনাকে রায় বাহাদুর উপাধি দিতুম।
দীনেশ: দিয়ে ফেল, দিয়ে ফেল। আচ্ছা রাজভোগটা এমনিই খাব না একটু মুড়ি নেব সঙ্গে?
বাদল: দুপিস তাজা বোমা দেব? খাবে দীনেশদা?
দীনেশ : উঁ? নাহ তোর হাতের রান্না তো! বিশ্বাস নেই। ধুর, মুড়ি ছাড়া হিরোজ ফিস্ট! এ যেন জল বিনে মাছ। শিং বিনে মোষ।
বাদল: টেগার্ট ছাড়া রাইটার্স।
দীনেশ: হয়েছে। রাইটার্স থেকে মেদিনীপুরের হয়ে মুড়ি লুঠ করব আজ। স্বামীজির কথামত একটা দাগ রেখে যাব। উফ খিদে পেয়ে গেল। কি করব? আবার প্রথম থেকে খাই?
বিনয়: দীনেশ, সাবধান। কোটের বোতাম না আটকালে এখন আর নিউ মার্কেট যাওয়া যাবে না কিন্তু।
বাদল: হ্যাট কোট টুপি পরে ম্লেচ্ছ সং সাজতেই হবে! ধুর ধুর, কত ইচ্ছে ছিল ধুতি পাঞ্জাবি পরে সিম্পসনের গলায় হাঁটু চেপে বসব।
বিনয়: ড্রেস কোড ভায়া! তাছাড়া রাইটার্সে ঢুকতে গিয়ে ধর দীনেশ ধুঁতির খুঁটে পা আটকে আছাড় খায় যদি, কেমন কেলেংকারি কাণ্ড হবে? ঝাড়া হাত পা থাকাই ভালো।
দীনেশ: হুঁ হুঁ, মাথা ঘুরেও পড়ে যেতে পারি, মুড়ির অভাবে দুর্বল বোধ করছি। রবিঠাকুর বলেছেন
ভোরে উঠেই পড়ে মনে,
মুড়ি খাবার নিমন্ত্রণে
আসবে শালিখ পাখি।
চাতালকোণে বসে থাকি…
বাদল: মাংসের ডেকচি শেষ। নিকুঞ্জদার হাত পা গুলো এনে দিচ্ছি চিবিয়ে খাও।
বিনয়: বাদল, রাইটার্সের ব্লু প্রিন্টটা আরেকবার। ফাইনাল টাইম। দীনেশ ভায়া, হাতে থালা নিয়েই খেতে হবে আপাতত।
আচ্ছা, এইখানে কারা বিভাগ।
বাদল: সিম্পসন ওখানেই থাকবে, সুভাষ বোসের জন্য স্পেশাল সেল বানানো নিয়ে ব্যস্ত আছে ভেতরের খবর। আর এই পাশেই হোম ডিপার্টমেন্ট। অ্যালবিয়ান মার এইখানে থাকবে। এইদিকে গেলে পাসপোর্ট অফিস। জুডিসিয়াল সেক্রেটারীকে পেয়ে যাব মনে হয়।
দীনেশ: এই রাইটার্সের লম্বা বারান্দাটা দেখে আমার কেন শক্তিগড়ের ল্যাংচার কথা মনে পড়ছে?
বাদল: পশ্চিমদিকের সিঁড়ি দিয়ে যদি উঠি..
বিনয়: বড্ড দূর হয়ে যাবে। ওটা প্ল্যান বি থাকুক। মেন প্ল্যান যেমন বলেছি, তিনজনে একসঙ্গে মেইন গেট দিয়ে সিঁড়ি নিয়ে নেব। লিফটে সিম্পসনকে দেখতে পেলে অবশ্য…
(ফেড আউট)
টেগার্ট
বিনয় বোস, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত। এই তিনজন ইয়োরোপিয়ান পোশাকে যখন রাইটার্সে ঢুকেছিল কেউ আঁচ করতেই পারেনি তিনটে নটোরিয়াস ক্রিমিনাল কি করতে চলেছে। আই.জি অফ প্রিজন এর অফিসে চাপরাশিটা জানতে চেয়েছিল ওরা কি চায়। তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘরে ঢুকে ওরা সিম্পসনের ওপর ছ'টা ফায়ার করে। ইন দ্য নেম অফ ডেভিল, সিম্পসন অবাক হবার সুযোগটুকু পায়নি, শরীর বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। আর ঐ নেটিভ ব্ল্যাক ম্যাজিকের মন্ত্রে গমগম করে উঠেছিল রাইটার্সের ব্যালকনি।
পরবর্তী অংশ শুনুন ইউটিউবে
তথ্যসূত্র
বই
- শৈলেশ দে. আমি সুভাষ বলছি
- Michael Silvestri. Policing “Bengali Terrorism” in India and the World: Imperial Intelligence and Revolutionary Nationalism, 1905–1939