ভূমিকা
ভরা বর্ষায় আঁচল পেতে বসে থাকে বঙ্গজননী। নদীনালার কূল ছাপিয়ে বন্যা হবে। কিছু রোয়া ধান ভেসে যাবে। কুঁড়ে গোয়াল ছেড়ে একটা ছাগল কি দুটো মুর্গি সম্বল করে হেঁটে যাবে চাষাভুষোর দল। সম্বচ্ছর উদ্বাস্তু হতে হয় তাদের। গ্রামের নেড়িগুলো অবাক চোখে দেখবে একরত্তি ভেলাগুলোতে তাদের ঠাঁই নেই। পরে, রোগব্যাধি ক্ষয়ক্ষতির ষোলকলা পূর্ণ করে, জল সরবে, রেখে যাবে প্লাবনভূমির উত্তরাধিকার।
ভরা বর্ষায় জল বাড়ে তাড়াতাড়ি। নদীতে, রাস্তায়, খাদানে কুলি কামিনরা কাজ বন্ধ করবে, কখনও তার আগেই ঘটে যাবে দুর্ঘটনা। ডুবে নিখোঁজ হয়ে যেতে যেতে মজুরদের মনে পড়বে না কতপুরুষ আগে, বিদেশী রাজাদের শিল্পবিপ্লব হওয়ার আগে, তাদের হাতে লাঙল ছিল, জল সরলে তারা সোনা ফলাত। কোনও এক গাঁয়ের বধূর গোলাভরা ধান ছিলো, উঠোনে আলপনা ছিলো। সে থাক। অপঘাত মানুষকে জাতিস্মর করবে এমন কোনো কথা নেই।
বর্ষামঙ্গল - আমাদের শেকড়ের কথা। গানে কবিতায় ছবি আঁকি।
নির্বাচিত চিত্রনাট্য
কথন
মরুভূমি থেকে দলে দলে শ্বেতাঙ্গ আর্য সিন্ধু উপত্যকায় পৌঁছে জম্বুদ্বীপে পেয়েছিল নতুন দেশ, দেখেছিল যে দেশে পূর্ণগর্ভা মেঘ এসে ভিজিয়ে দেয় তৃষার্ত ভূমি, বীজের অঙ্কুরোদ্গম আপনি ঘটে যায়, যে দেশে খাদ্যের জন্য রক্তদর্শন অবধারিত নয়, সেই দেশে বাস করা যায়, যাযাবর জীবন গার্হস্থ্য পায়।
কে বলতে পারে হাজার হাজার বছর আগে আর্য অতিথিদের হর্ষধ্বনি মিশে গিয়েছিল হয়ত অনার্য ভূমিকন্যা ভূমিপুত্রদের দ্রিম দ্রিম বর্ষামঙ্গলের তালে? কে দেখেছে?
গান
কথন
শস্য চেনা হল, ভূমি কর্ষণ হল। নতুন আগন্তুকের দলের সঙ্গে এল নতুন রোগ, ব্যাধি। অনার্যভূমি চিনল মহামারী। আর্যাবর্তের পত্তন হল সিন্ধু, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, নর্মদার স্রোত অনুসরণ করে। এর অনেক অনেক চাঁদ পরে, ততদিনে রোহিনীর জলের বিবাদে রক্তক্ষয় দেখে সিদ্ধার্থ হয়েছেন তথাগত, ষোড়শ মহাজনপদ এক রাজছত্রের তলায় শোভা পাচ্ছে, সেই ততদিনে কবিকুলতিলক হাতির মত ভারী মেঘ দেখে লেখছেন বিরহী যক্ষের মিলন আর্তি। হে ভারত, আরোও অনেক অনেক বর্ষা পরেও প্রেম পেলে তুমি? মাতৃভৃমি?
গান
কথন
কবিবর, কবে কোন্ বিস্মৃত বরষে/ কোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে/ লিখেছিলে মেঘদূত। মেঘমন্দ্র শ্লোক বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক/রাখিয়াছ আপন আঁধার স্তরে স্তরে/ সঘন সংগীত মাঝে পূঞ্জীভূত ক’রে।
গান
কথন
বর্ষায় ভিজে ফুটবল খেলাটা দস্তুর, বালকদের জন্য। বর্ষায় ছাতা নিয়ে সাবধানে স্কুলে যাওয়া দস্তুর, বালিকাদের জন্য। কে করে দিল এই দস্তুর? সেই যে শস্যে, খাদ্যে তৃপ্ত ইন্দ্রপূজারীরা শিকার কমিয়ে দিলেন, সেই থেকে, বল্লম, তীর ছুঁড়তে, খ্যাপা শুয়োরকে হুড়ো দিতে দলে ভারী হতে লাগে না বুঝি আজ? নারী মন দেবে সন্তানপালনে, পশুপালনে, ব্যাস, এই? অভিশাপ লাগবে না? কেমন হবে যদি মৌসুমী বায়ু বেছে নেয় কোনো ঘুরপথ? যদি বর্ষা বলে, আর আসব না? ভয় পেতে শেখ হে সমাজ, আর সময় নেই বিশেষ। ঐ দেখ কোন পাগলিনী গায়
গান
কথন
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মত চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে-
'অবনী বাড়ি আছো'?
বাড়িতে থাকা যায়? থাকতে দিলে তো? মেঘ নাকি কোনকালে কোন যক্ষের ভালোবাসার চিঠি পৌঁছে দিয়েছিল, সেই ভালোমানুষ মেঘেদের দিন গেছে গো কবি। জান, নিশির ডাকের মত মেঘ এখন মানুষ ধরে নিয়ে যায়? তারপরে তাদের কোন অচিনপুরে নিয়ে রেখে দেয়,সেখানে সে হতভাগা মানুষের বুকের ভেতরে, মাথার মধ্যে -
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মত চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে -
ঠিক, যেন, রূপকথা! না?
কবিতা
কথন
মেঘ মল্লারের অনিবার্য উত্তরাধিকার আমাদের। রাত্রি দ্বিপ্রহর হোক বা বর্ষণমুখর আশ্চর্য মুহূর্ত, শুকনো বেহড় হোক কিংবা নুনে জমাট গরম কচ্ছের রান, সঙ্গীত থেকে যায় আমাদের শেষ আশ্রয়। কাবেরী থেকে তিস্তা, নর্মদা থেকে নমো গঙ্গে, পানির এই দেশ, জলের এই দেশেই ফারহাদ খুঁড়েছিল পাহাড়, সুলতানের প্রাসাদ অবধি সুলতানের সাধের দুধের নদী বানাতে। শিরিন মরে গেছে শুনে আশিক দিওয়ানা ফারহাদ মাথায় গাঁইতি ঠুকে মরে গেল যেদিন তার সদ্য খোঁড়া খাতে দুধ নয়, জল নয়, বইল রক্তের ধারা। কত বৃষ্টি হলে, আর কত বৃষ্টি হলে রক্তের দাগ মোছে ঠিক? মরশুমী কদম জানে? মালহার জানে?
গান
কথন
বর্ষা শুধু দিতে তো আসে না? বেছে বেছে সে বলি নিয়ে যায় মর্জিমাফিক। কাদের নেই মাথার ছাউনি, কার ঘর গেছে তলিয়ে হঠাৎ জেগে ওঠা নদীর রাক্ষুসে হাঁয়ে, কারা নাকি আদৌ ভেসে যায়নি কোনোদিন, সরকারি অঙ্কে তারা হঠাৎ নিখোঁজ কিছু নম্বর হয়ে যায়। কারা ফিরতে চায়, শুখারুটি, ছাতুমুড়ি থেকে মাছভাতের সুদিনে ফেরার রাস্তা বড় দীর্ঘ। তাই বলে যাত্রা কবে আর থেমেছে? কুমীরমারি, কচুখালি, রাঙাবেলিয়ার বাদাবনের কোনো গৃহস্থ কুঁড়েতে হয়ত বেঁচে আছে এখনও দুটো ছাগল, একঘর মুর্গি, কিংবা এক-আধটা জলজ্যান্ত মানুষ। বিকিকিনির বাজারে নিলেম হয়ে যাওয়া বঁধু কখনও ফিরবেই, এই আশায় বসে থাকা, ফুলেফেঁপে ওঠা মাতলার ধারে ঘর সামলে বসে থাকা। বর্ষা শুধু দিতে তো আসে না?
গান
কথন
বর্ষা বুঝি মন খারাপের ঋতুও বটে? সেকালে বানভাসি গ্রামে দিনের পর দিন মেয়ে বৌরা চারপাইতে পা মুড়ে বসে ফেলে দেওয়া কাপড় জুড়ে জুড়ে নকশায় ফুটিয়ে তুলত প্রেম, বিরহ, প্রকৃতির মনের কথাগুলি। পরে সওদাগরেরা তার গালভরা নাম দেয় কাঁথা সেলাই অমুক তমুক বলে, তারপরে সে বানভাসি গ্রাম সময়ের জঠরে তলিয়ে গিয়েছে। রয়ে গেছে নকশি কাঁথার বুননে বোনা মন খারাপের গল্পগুলো। তেমন তেমন মুহূর্তে, সে একঘেয়ে বর্ষার রাত হোক কিংবা ঝকঝকে জলের রোদ, যদি হঠাৎ করে অন্যমনস্ক হওয়া যায়, পুবের হাওয়ার মত হু হু করে ঢুকে পড়ে সেই সব ভোলা গল্প অবচেতনের গভীরে। মন খারাপের দিনরাত আচ্ছন্ন করে দেয় অবুঝ কান্নায়।
'এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হ'য়ে যায় যেন'
কবিতা
কথন
সেই তো এক একটা রেনি ডে মনে থেকেই যায়, যায় না? আধভিজে শাড়িতে আলো আঁধার জনবিরল ক্লাসে বসে থাকা। তেমন করে বর্ষা নামলে অনেক বন্ধুই পৌঁছতে পারত না স্কুল অবধি। আর যারা সেই পৌঁছেই যায়, তাদের কথা বলার, ঝগড়া করার সেই বন্ধুর বসার জায়গাটা খালি থাকত, হয়ত আজও আছে? কে জানে, কে বলতে পারে? Mad Balikas জানে?
গান