কাণ্ডারী তব সম্মুখে ওই পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালির খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর
ওই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর।
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।
কাজী নজরুল ইসলাম এ কবিতা লিখে তড়িঘড়ি এসে রবি ঠাকুরকে শুনিয়ে গেলেন। তার কয়েকদিন পরের কথা। ১৯২৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর।
প্রেসিডেন্সি কলেজে এক সভায় কবিগুরু আজকের ব্রেকিং নিউজের ভাষায় বিস্ফোরক হয়ে উঠলেন। রক্ত অর্থে 'খুন' শব্দ ব্যবহার হচ্ছে কবিতায়, এই সব ফ্যাশন তুলোধনা করলেন।
রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন তা বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্নভাবে ছাপা হয়। 'প্রবাসী' পত্রিকায় লিখল:
"সেদিন কোনো একজন বাঙালি হিন্দু কবির কাব্যে দেখলুম তিনি রক্ত শব্দের জায়গায় ব্যবহার করেছেন 'খুন'। পুরাতন 'রক্ত' শব্দে তাঁর কাব্যে রাঙ্গা রং যদি না ধরে তা হলে বুঝব সেটা তাঁরি অকৃতিত্ব। তিনি রঙ্গ লাগাতে পারেন না বলেই তাক লাগাতে চান। আমি তরুণ বলব তাঁদেরই যাঁদের ঊষাকে নিয়ুমার্কেটে 'খুন' ফরমাস করতে হয় না।"
অন্যদিকে 'শনিবারের চিঠি'তে প্রকাশিত সজনীকান্ত দাসের রিপোর্ট অনুসারে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন :
"...সেদিন কোন একজন বাঙালি কবির কাব্যে দেখলুম, তিনি রক্ত শব্দের জায়গায় ব্যবহার করেছেন 'খুন'।"
এসব পড়ে নজরুল ভেবে বসলেন রবীন্দ্রনাথ বুঝি তাঁকে লক্ষ্য করেই করেই 'খুন' শব্দের সমালোচনা করেছেন। এই নিয়ে মান অভিমান লেখালেখি চলেছিল বহুদিন। সত্যি কি কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতা রেফার করেই কথাটা বলেছিলেন রবিবাবু? ঊষা অর্থে “উদিবে সে রবি” যদি না হয় তবে খুন কোথায় আর কে ব্যবহার করেছেন?
মজার কথা হলো রবীন্দ্রনাথ নিজে ধর্মমতে ব্রাহ্ম, অথচ ফারসি ভাষার প্রয়োগে তিনি নাক কুঁচকে ফেলছেন। তবে কি পূর্বপুরুষের হিন্দু সংস্কার কোথাও বহাল তবিয়তে বেঁচে ছিলো?
একশো বছর আগের ইতিহাস হেজিয়ে লাভ নেই। আজকের হিন্দু বাঙালি দেশভাগ দেখেছে, রিফিউজি হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণ দেখেছে, ভয় দেখানোর রাজনীতি দেখেছে। ইতিহাসে লেখা থাকবে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু ছিলো হিন্দু খতরে মে হ্যায়।
"হিন্দু বাঙালি বিপন্ন" — এই বাক্যটা আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাজারের সবচেয়ে দামি পণ্য। বিজেপি নেতৃত্ব ভোটের প্রচারে এসে বলে যাচ্ছেন ভোটার লিস্টে নাকি লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারী, চারদিকে নাকি কোটি কোটি রোহিঙ্গা পিলপিল করছে। কলকাতায় অনুপ্রবেশকারীরা বস্তি বানিয়েছে, কলকাতা এখন বস্তির শহর।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে, কবির এই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে হয়েছে।
কবিদের দিনকাল খুবই খারাপ। রবি নজরুল জীবনানন্দ মায় সুকুমার রায় বেঁচে থাকলে কোনদিন ফাঁসি যাবে নয় যাবে জেলে সত্যি হয়ে যেত।
এখনকার কবি তো আবার অভিশাপ লিখে জেলে চলে যাচ্ছিলেন। শ্রীজাতর কথা বলছি। নয় বছর পুরনো মামলায় হঠাৎ সমন পেয়েছেন তিনি। একটা কবিতা নিয়ে মামলা। তো সেই কবিতায় বলাই আছে,
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই…
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।
শ্রীজাতর সেই নয় বছর আগের লেখা কবিতা, যেটা কিনা ভোটের আগে গরম হাওয়ায় ভেসে উঠেছে, সেখানেও হিন্দুদের বিলক্ষণ বিপদ দেখা যাচ্ছে। কী লিখে তিনি বারবার জনরোষের শিকার হলেন?
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!
ত্রিশূলের মেটাফরেই সমস্যা। কিন্তু আধুনিক শিল্পে শক ভ্যালু তো থাকেই। শক পেয়ে সমাজ চমকে উঠে ক্যাও ম্যাও করেই, তবেই শক ভ্যালুর সার্থকতা। ওই একই সময়ে ম্যাডোনা গাইছেন ডোন্ট আই টেস্ট লাইক হোলি ওয়াটার। তুমুল বিতর্ক উঠছে ক্যাথলিক ধর্মের অপমান নিয়ে, তাঁর রেবেল হার্ট অ্যালবামে বসছে বিধি নিষেধ। তাই বলে কি ক্যাথলিকরা খতরে মে হয়ে গেছেন?
কবিতার কাব্যগুণ ছেড়ে ত্রিশূলের মেটাফর নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন যারা তাঁরাই তো বিপন্ন? কারা এই বিপন্ন হিন্দু বাঙালি? ভদ্রলোক উচ্চবর্ণ কলকাতার বাসিন্দা? নাকি পুরুলিয়া-র আদিবাসী কৃষক? নাকি কোচবিহারএর রাজবংশী চা-শ্রমিক? নাকি নোয়াখালি থেকে আসা নমঃশূদ্র শরণার্থীর তৃতীয় প্রজন্ম? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: এই হিন্দু বিপন্নতার আখ্যান কার কাজে লাগছে?
প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তরগুলো? চলুন না, জন্মনিরোধক বিতর্ক থেকে বেরিয়ে একটু এর উল্টোদিকে যাই। আঁতুড়ঘরে ঢুকি। কেমন আছে হিন্দু মা হিন্দু শিশুরা? খতরে মে?
হিন্দু বাঙালি বিপন্ন — এই আখ্যানে যদি সত্যিই কিছু থাকে, তাহলে হিন্দু-প্রধান রাজ্যে বা জেলায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য অপেক্ষাকৃত ভালো থাকার কথা। তাই না? আসুন, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ২০১৬ আর ২০২১ এর ফারাক দেখি।
কী দেখব একটু জেনে নিই।
- Severe Wasting অর্থাৎ তীব্র অপুষ্টিজনিত ক্ষয়
- Stunted অর্থাৎ পুষ্টির অভাবে বৃদ্ধি থমকে যাওয়া শিশু
এছাড়া রক্তশূন্যতা একটা পরিচিত সমস্যা। এই সার্ভেতে এইগুলো মাপা হয়।
গুজরাতে শিশুদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার ৮০% — সারা ভারতে সর্বোচ্চ। গুজরাত কিন্তু মোদিজির রাজ্য। "বিকাশের মডেল"। শিশু রক্তশূন্যতায় সারা দেশে এক নম্বর।
উত্তর প্রদেশ, যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে Severe Wasting, অর্থাৎ তীব্র অপুষ্টিজনিত ক্ষয় বেড়েছে ৬% থেকে ৭.৩%-এ। রক্তশূন্য শিশু ৬৩% থেকে ৬৬%-এ বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা কভারেজে ৭০% ঘাটতি রিপোর্ট করা হয়েছে — সারা দেশে সবচেয়ে খারাপ ফল। UP-তে ৪০% শিশু stunted, অর্থাৎ পুষ্টির অভাবে বাড়ছে না শিশুরা। বিহারে এই সংখ্যা ৪৩%।
কেরলে মুসলিম ও খ্রিস্টান জনসংখ্যা মিলিয়ে রাজ্যের ৪৫%। সেখানে হিন্দুরা বিপন্ন কি? শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যে কেরল তো দেশে সেরা হয়ে আছে। তাহলে গল্পটা পশ্চিমবঙ্গে কেমন?
পশ্চিমবঙ্গে ৬৯% শিশু অ্যানিমিয়ার শিকার। NFHS-5 তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ৫ বছরের কম বয়সী ৩৪% শিশু stunted। ২০% wasted। এই হার NFHS-4 থেকে বেড়েছে।
হিন্দু-প্রধান জেলা হিসেবে পুরুলিয়া আর বাঁকুড়া যদি ধরে নিই, খুব ভুল হবে না। পরিষ্কার স্যানিটেশন ব্যবহারের দিক থেকে পুরুলিয়া সারা ভারতে সবচেয়ে পিছিয়ে — মাত্র ২৯.২% পরিবারের উন্নত শৌচাগার আছে। এই জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৭.৭৬%। শৌচাগার নেই, পরিষ্কার জল নেই — এর দায় কাদের উপর চাপানো যায়?
পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ার আদিবাসী ও সিডিউল কাস্ট শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার রাজ্য গড়ের চেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে চা-শ্রমিক এবং বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে malnutrition বেশি।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ২০১৬ থেকে ২০২১ এর মধ্যে সব জেলায় রক্তশূন্যতা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি মুর্শিদাবাদে, তারপর নদিয়া, মালদা ও পশ্চিম মেদিনীপুর।
রক্তশূন্যতার মহামারী ধর্ম মানছে না। নির্বাচনী প্রচারে কেন মায়েদের কথা আসছে না? বিজেপি নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলতে পারতেন তো, বাল্যবিবাহে বাংলার মেয়েরা এ দেশে কেন দ্বিতীয় স্থানে?
এ সব প্রশ্ন সিলেবাসে আনা যাবে না, কারণ বাল্যবিবাহে দেশে টপার রাজ্য বিহার। সেখানে বিজেপি জোট এতদিন ক্ষমতায়। এইভাবেই স্কুলের বেসরকারিকরণ, স্বাস্থ্যের বেহাল দশা নিয়ে যাদের যুক্তিতর্ক করার কথা ছিলো তাঁদের ফেভারিট টপিকগুলো ক্রমশ "নাগরিক", "অনুপ্রবেশকারী", "ভুয়ো ভোটার" — এই ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কেন চাকরি নেই? কেন মজুরি বাড়েনি? কেন চা-বাগান বন্ধ? এই প্রশ্নগুলো "মুসলিম অনুপ্রবেশ"-এর প্রশ্নে পরিবর্তন হয়ে গেলে সুবিধা কাদের?
তাহলে হিন্দু বাঙালি ভালো আছেন?
কলকাতার সরকারি কর্মচারীরা DA পাচ্ছেন না। তাঁদের দিল্লির সমতুল্য সহকর্মী অনেক বেশি পাচ্ছেন। শিক্ষকনিয়োগে দুর্নীতি। স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়ে IIT পাশ করে পুনে নয়ডা চাকরি করতে যাচ্ছে। হতাশা সত্যিকারের।
কিন্তু এই হতাশার কারণ । রাজ্যের per capita income জাতীয় গড়ের ২০% নিচে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সন্তান যে রাজ্যে থাকার কথা, সেই রাজ্যে ভালো চাকরি নেই — কারণ বড় ধারাবাহিক বিনিয়োগ নেই, উচ্চমেধা ব্যবহার করার মতন যথেষ্ট আইটি কোম্পানি নেই। এই সমস্যার নাম তো মুসলমান নয়!
তাহলে এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে আমাদের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে ফিরতেই হবে।
ইতিহাসে একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। যখনই কোনো শ্রেণি তার রাজনৈতিক আধিপত্য হারানোর ভয় পায়, সে সবার আগে একটা শত্রু খোঁজে। শত্রু না থাকলে তৈরি করে। বাঙালি ভদ্রলোকের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি।
১৮৭২ সালের census-এ প্রথম জানা গেল: বাংলা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। এই তথ্যটা ভদ্রলোকের মনে যে ভয় তৈরি করল, সেই ভয়ের রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটল ১৯৩২ সালে Communal Award-এর পর।
Joya Chatterji লিখেছেন:
“Communal Award বাংলার আইনসভায় প্রথমবার মুসলমানদের হিন্দুদের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এল। এই পরিবর্তনে ভদ্রলোকের তীব্র প্রতিক্রিয়া তাই অবাক করার নয়। তারা ব্রিটিশ নীতির জাতীয়তাবাদী সমালোচনা না করে রাগ ঝাড়ল বাঙালি মুসলমানদের উপর।”
এই প্যাটার্ন-টা খেয়াল করুন। ক্ষমতার আসল কেন্দ্র — ব্রিটিশ রাজ — ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকল। পাশের প্রতিবেশী, যে হয়তো সদ্য কিছুটা অধিকার পেল, সে হলো শত্রু। বহু শক্তি তাদের সুবিধা সংকুচিত করতে উদ্যত হওয়ায় ভদ্রলোক অভিজাত সমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদ থেকে সরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে গেল। ভয় ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য হারানোর।
পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা তাহলে শ্রেণিগত ও অর্থনৈতিক সংকট হয়ে দাড়াচ্ছে। কিন্তু সেটাকে বুঝে শুনে সুকৌশলে সাম্প্রদায়িক সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। রোগ হয়েছে বুকে, অপারেশন হলো ফিসচুলা।
এই misdiagnosis তিনটে ভিন্ন সংকটকে একটা ধর্মীয় খামে ভরছে। প্রথম সংকট — ভদ্রলোকের হেজেমনি ক্ষয়। রাজ্যের অর্থনৈতিক অধঃপতনে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সুযোগ কমছে। এই বাস্তব যন্ত্রণা ভোলার জন্য একটা সহজ শত্রু দরকার। গরিব মুসলমান এ দেশের সবচেয়ে সহজলভ্য শত্রু।
দ্বিতীয় সংকট — প্রান্তিক হিন্দুর অর্থনৈতিক বঞ্চনা। চা-বাগান শ্রমিক, রাজবংশী , মতুয়া , আদিবাসী — এঁদের সংকট সত্যিকারের। কিন্তু সেটা সমাধান না করে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ে মোবিলাইজ করা হচ্ছে। গরিব নিম্নবর্ণের হিন্দু এ দেশের সবচেয়ে সহজলভ্য মস্তিষ্ক।
তৃতীয় সংকট — রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পতন। TMC-র Welfare মডেল মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে টিকিয়ে রাখে, দারিদ্র্য নির্মূল করে না। যেখানে প্রয়োজন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের, সেখানে প্রতিমাসে ব্যান্ড এইড লাগিয়ে সমস্যা কি সারে?
এই সব সংকট একটা ধর্মীয় আখ্যানে মুড়িয়ে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কার্যকর — কারণ সমস্যার ডায়াগনসিস ভুল হলে সমাধান খোঁজার দায় থাকে না।
হিন্দু বাঙালি কবে থেকে বিপন্ন? যখন থেকে তাঁকে শেখানো হয়েছে যে তাঁর সংকটের কারণ পাশের বাড়ির মুসলমান প্রতিবেশী — এবং তিনি সেটা বিশ্বাস করেছেন। তার আগে তিনি বিপন্ন ছিলেন না।
Stunted শিশু মসজিদের মাইক নিয়ে ভাবে না। রামমন্দির নিয়ে ভাবে না। সে শুধু বাড়তে চায়। কিন্তু তার শরীরে পুষ্টি নেই।
গুজরাতে ৮০% শিশু রক্তশূন্য। UP-তে ৪০% শিশু stunted। পশ্চিমবঙ্গে ৭১% মহিলা রক্তশূন্য।
হিন্দুত্বের রাজনীতি এই সংখ্যাগুলোর কোনো উত্তর দেয়নি। দেওয়ার কথা নয় — কারণ উত্তর দিলে প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে। প্রশ্ন মারা গেলে? মানুষের দায় ঝেড়ে ফেলা চলে। ইতিহাস ভুলে যাওয়া চলে। ভুলে যাওয়া যায় যে আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে শত্রু কে ছিল!
সন্তান দলের শত্রু ছিলো ইংরেজ। সেটাই স্বাভাবিক। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হয়েছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে।
কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই সরকারি কর্মচারী! স্বাধীন ভারতেই সরকারি কর্মচারীদের মত প্রকাশের বিধি নিষেধ থাকে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে রাগ করবে এ আর অবাক কিছু তো নয়! ধারণা করা হয়, সরকারি গোঁসা থেকে বাঁচতে চাকরির খাতিরেই কাহিনীর দ্বিতীয় সংস্করণে সন্তান দলের শত্রু হলো মুসলমান সম্রাট।
এ তো সামান্য সম্পাদনা নয়। এ হলো আদর্শের ডিগবাজি! আসল শত্রু ছিল ব্রিটিশ, রাগ মেটানো হলো মুসলমানের উপর। যে বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথম বিদ্রোহ, তার একটি সূর্য ভবানী পাঠকের সন্ন্যাসী দল, অপর সূর্য মজনু শাহের ফকির দল। উপন্যাসের দলিলে ভবানী পাঠক থেকে গেলেন, মজনু শাহ কাটা পড়লেন শুধু তাই নয়, তাঁর ধর্মের লোকজনই ভিলেন হয়ে গেলেন। জাতীয়তাবাদের মধ্যে মূর্তিপুজোর মিশেল পড়ার ফলে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ দেখা দিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের।
এই বিভেদের লাভের গুড় যুগ যুগ ধরে খেয়ে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ব্রিটিশ সরকার। ভদ্রলোকের রাজনীতি পূর্ণবৃত্ত ঘুরে এসেছে বারবার।
২০২৬-এ আসল সমস্যা দারিদ্র, কিন্তু রাগের অভিমুখ ঘোরানোর চেষ্টা মুসলমানের উপর। কিছু করার নেই। সারা পৃথিবীতে চাকরি কমছে, দেশের অবস্থা সামাল দিতে কাছা খুলে যায়। উপায়? ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালির সেই কাটা ঘায়ের জায়গাটা ছিলো না? রিফিউজি কাটাতারের ক্ষত কি সহজে যায়? অভিনেতা না হয় বদলেছে। রাজ্যে গরিব চালচুলোহীন মানুষ কি তাই বলে কম পড়েছে? তাই চিত্রনাট্য সেই একই।
হিন্দু বাঙালি — বিশেষত ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালি — আসলে বিপন্ন নন। তিনি বিভ্রান্ত।
এই ভ্রান্তিবিলাসের শেষ কোথায়?
References
Articles
- Relative Economic Performance of Indian States: 1960-61 to 2023-24 (pdf) | Sanjeev Sanyal, Aakanksha Arora | Economic Advisory Council to the Prime Minister (EAC-PM), Advisory Body to Government of India | September 2024
Reports
- National Family Health Survey (NFHS-5), 2019-21 (pdf) | KS James, SK Singh, Hemkhothang Lhungdim, Chander Shekhar, Laxmi Kant Dwivedi, Sarang Pedgaonkar, Fred Arnold | Ministry of Health and Family Welfare, Government of India | March 2022
- Structural Stagnation of West Bengal’s Economy: A Review of Economic, Fiscal and Developmental Trends | FinSkeptics.com | 2026-04-11
Books
- Contextualising Anaemia Among Reproductive Women in West Bengal: Trends, Patterns, and Predictors (Book Chapter) [Sexual and Reproductive Health of Women: Dimensions and Perspectives (Book)] | Subhojit Let, Seema Tiwari & Aditya Singh | Springer Singapore | 2025-01-31
- Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947 (Internet Archive) (Library of Congress) | Joya Chatterji | Cambridge South Asian Studies, Series #57 | Cambridge University Press | 2010-08-04
- The Swadeshi Movement in Bengal, 1903-1908 (Internet Archive) | Sumit Sarkar | People's Publishing House, New Delhi | 1973